ঢাকার ট্যাপের পানি কি পান করা নিরাপদ?
ঢাকা ওয়াসার পানির স্বাধীন পরীক্ষায় কী পাওয়া গেছে, দূষণ কোথা থেকে আসে, আর ঘরে ও চলার পথে ট্যাপের পানি কীভাবে নিরাপদ করা যায়।

সংক্ষেপে উত্তর
সরাসরি ট্যাপ থেকে খাওয়ার জন্য ভরসাযোগ্য নয়। ঢাকা ওয়াসা বলে, শোধনাগার থেকে বের হওয়ার সময় পানি নিরাপদ থাকে, কিন্তু স্বাধীন পরীক্ষায় বারবার বাসার ট্যাপ ও পাইপলাইনের পানিতে কলিফর্ম ও ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। বেশিরভাগ দূষণ ঘটে শোধনের পরে, পাইপ, ট্যাংক ও সংরক্ষণের পাত্রে। পান করার আগে ট্যাপের পানি শোধন করে নিন।
ঢাকায় কাউকে জিজ্ঞেস করুন তিনি সরাসরি ট্যাপ থেকে পানি খান কি না, বেশিরভাগই বলবেন, না। তাঁদের সতর্কতা যথার্থ। ঢাকা ওয়াসার শোধনাগার থেকে বের হওয়া পানিকে সাধারণত নিরাপদ বলা হয়[১], কিন্তু রান্নাঘরের ট্যাপে পৌঁছানোর আগে সেই পানি কয়েক কিলোমিটার পুরোনো পাইপ পেরোয়, ছাদ ও মাটির নিচের ট্যাংকে জমে থাকে, আর প্রায়ই জগ বা বোতলে ঢালা হয়। এর প্রতিটি ধাপেই পানিতে ব্যাকটেরিয়া মিশতে পারে।
স্বাধীন পরীক্ষায় আসলে কী পাওয়া গেছে, দূষণ কোথা থেকে আসে, আর ট্যাপের পানি নিরাপদ করার বাস্তব উপায়গুলো কী, এই গাইডে তা একসঙ্গে তুলে ধরা হলো।
ঢাকার ট্যাপের পানির পরীক্ষায় যা পাওয়া গেছে
ঢাকার ট্যাপের পানি নিয়ে সাম্প্রতিক, পুরো শহরজুড়ে কোনো একক জরিপ নেই। যা আছে তা হলো কয়েকটি গবেষণা ও সরকারি পরীক্ষা, আর সবগুলো একই দিকে ইঙ্গিত করে: ব্যবহারের জায়গার চেয়ে উৎসে পানি বেশি পরিষ্কার।
| গবেষণা | যা পরীক্ষা করা হয়েছে | যা পাওয়া গেছে |
|---|---|---|
| মাহবুব ও সহকর্মীরা, ২০১১[২] | ৪৫টি নমুনা: বাসার ২৯টি ট্যাপ, রাস্তার পাইপলাইনের ৫টি ট্যাপ, ওয়াসার ১১টি উৎস পাম্প | ৫১% নমুনায় ই. কোলাই আর ৫৮% নমুনায় কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া। বাসার ট্যাপের ৬২% নমুনা ব্যাকটেরিয়ার সীমা ছাড়িয়েছে, পাম্পে যা ছিল ৪৫%। |
| সরকারি উদ্যোগে পরীক্ষা, ২০১৯[৩] | ওয়াসার ১০টি জোন ও চারটি উৎসস্থল থেকে ৩৪টি নমুনা, পরীক্ষা করেছে বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও আইসিডিডিআর,বি | ৮টি নমুনা দূষিত। ১, ৪ ও ৭ নম্বর জোনে কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া। |
| ল্যাঙ্কাস্টার বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ২০১৭[৪] | চারটি বস্তি এলাকায় ওয়াসার সরবরাহের শেষ বিন্দু ও বাসায় জমিয়ে রাখা পানি থেকে ৪৮০টি নমুনা | সরবরাহের শেষ বিন্দু থেকে সংগ্রহের পরের পানির ৯৯%-এ মলজনিত দূষণ; সরবরাহ বিন্দুতে তা অনেক কম। |
নমুনা সংগ্রহের জায়গা ও পদ্ধতিভেদে ফলাফল আলাদা, আর কিছু গবেষণা পুরোনো। সবগুলোর লিংক শেষে তথ্যসূত্রে দেওয়া আছে।
কোনো একটি সংখ্যার চেয়ে এই গবেষণাগুলোর ধরনটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ২০১১ সালের গবেষণায় বাসা ও রাস্তার ট্যাপের পানি ওয়াসার উৎস পাম্পের চেয়ে বেশি দূষিত ছিল[২], তাই গবেষকেরা সরবরাহ লাইনকে দায়ী করেন। ২০১৭ সালের গবেষণায় এক ধাপ পরে একই চিত্র দেখা যায়: সরবরাহ থেকে বের হওয়ার জায়গায় পানি অনেক পরিষ্কার ছিল, মানুষ তা সংগ্রহ করে জমিয়ে রাখার পরের তুলনায়[৪]।
শোধনের পরেও পানি কেন নোংরা হয়
শোধিত পানি আপনার কাছে পৌঁছানোর পথে তিন জায়গায় ব্যাকটেরিয়া মিশতে পারে।
- পাইপ। ড্রেন ও স্যুয়ারেজের কাছ দিয়ে যাওয়া পুরোনো বা ফুটো পাইপে দূষিত পানি ঢুকে পড়তে পারে, বিশেষ করে যখন সরবরাহ মাঝেমধ্যে বন্ধ থাকে আর চাপ কমে যায়। ওয়াসার উৎস পরীক্ষা নিয়ে ২০২২ সালে ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয় ঠিক এই কথাই বলেছে: লাইনে ফুটো থাকলে শোধনাগারে পানি নিরাপদ হওয়ার তেমন মানে নেই[১]।
- ট্যাংক। বেশিরভাগ ভবনে পানি ছাদের বা মাটির নিচের রিজার্ভারে জমিয়ে রাখা হয়। ট্যাংক পরিষ্কার ও ঢাকা না থাকলে তাতে ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে ও ময়লা জমতে পারে।
- আপনার নিজের সংরক্ষণ। বাসাবাড়ির পানি নিয়ে এক জাতীয় গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যবহারের জায়গার দূষণ উৎসের দূষণের সঙ্গে জোরালোভাবে সম্পর্কিত, আর বাসায় পানি শোধন করলে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে[৫]। কালেভদ্রে ধোয়া জগ, বোতল ও ডিসপেন্সার প্রায়ই ব্যাকটেরিয়া মেশার শেষ ধাপ।
শুধু ব্যাকটেরিয়া নয়
ট্যাপের পানি সরাসরি না খাওয়ার প্রধান কারণ ব্যাকটেরিয়া, তবে এতে আরও কিছু থাকে। ২০২৪ সালের এক গবেষণায় বাংলাদেশের চারটি বড় শহরের সরবরাহকৃত ট্যাপের পানির প্রতিটি নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, প্রতি লিটারে গড়ে ৩৫.৩৩টি কণা, যার বেশিরভাগ ক্ষুদ্র আঁশ[৬]। গবেষকেরা এগুলো দূর করার জন্য শোধন প্রক্রিয়াকে অপর্যাপ্ত বলেছেন। কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ, তা আমাদের মানবদেহে মাইক্রোপ্লাস্টিক গাইডে পড়ুন।
ট্যাপের পানি কীভাবে নিরাপদ করবেন
এর মানে এই নয় যে ট্যাপের পানি ব্যবহার করা যায় না। মানে হলো, পান করার আগে আরও একটি ধাপ দরকার।
ঘরে
- ঠিকমতো ফোটান। টগবগ করে ফোটালে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও পরজীবী মারা যায়[৭]। একই ঢাকনা দেওয়া পাত্রে ঠান্ডা হতে দিন, বা পরিষ্কার, ঢাকনাওয়ালা পাত্রে ঢালুন; ফোটানো পানি নোংরা জগে ঢাললে আবার দূষিত হয়[৮]।
- পাত্র পরিষ্কার রাখুন। জগ, বোতল ও ডিসপেন্সারের কল নিয়মিত ধুয়ে নিন, আর জমিয়ে রাখা পানি ঢেকে রাখুন।
- ভবনের ট্যাংকের খোঁজ নিন। ছাদ বা মাটির নিচের রিজার্ভার শেষ কবে পরিষ্কার করা হয়েছে, জেনে নিন।
চলার পথে
ফোটানো পানি সঙ্গে বয়ে বেড়ানো সহজ নয়। ক্যাম্পাস, অফিস বা চায়ের দোকানের ট্যাপে ফিল্টার বোতল পান করার সময়ই পানি শোধন করে। ভালো ফিল্টার বোতল ট্যাপের পানির প্রধান ঝুঁকি, ব্যাকটেরিয়া ও পরজীবী, দূর করে, সঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিকও। পানি ফোটানো, ফিল্টার বোতল আর বোতলজাত পানির খরচ এবং কোনটি কী দূর করে আর কী করে না, তা আমাদের তুলনামূলক গাইডে দেখুন।
মূল কথা
ঢাকার ট্যাপের পানি শোধন হয়েই যাত্রা শুরু করে, কিন্তু পথে প্রায়ই ব্যাকটেরিয়া নিয়ে পৌঁছায়। ট্যাপের প্রতিটি গ্লাস পানি শোধন করে নিন: ঘরে ফুটিয়ে, বাইরে ফিল্টার করে, সংরক্ষণের পাত্র পরিষ্কার রেখে। আর মনে রাখুন দুটি পরিস্থিতি, বন্যা ও নলকূপ, যেখানে শুধু ফিল্টার যথেষ্ট নয়।
মানুষ যা জানতে চান
শোধনাগারে ঢাকা ওয়াসার পানি কি নিরাপদ?
ঢাকা ওয়াসা ও আইসিডিডিআর,বি-র এক যৌথ সমীক্ষায় উৎসে পানিকে নিরাপদ বলা হয়েছিল, কিন্তু তাতে ট্যাপ বা পাইপের পানি পরীক্ষা করা হয়নি। সমস্যা হলো শোধনাগার থেকে আপনার গ্লাস পর্যন্ত পথটুকু: স্বাধীন পরীক্ষায় পাইপলাইন, বাসার ট্যাপ ও জমিয়ে রাখা পানিতে ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে।
পানি ফোটালে কি ঢাকার ট্যাপের পানি নিরাপদ হয়?
টগবগ করে ফোটালে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও পরজীবী মারা যায়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) তা নিশ্চিত করেছে। তবে ফোটালে রাসায়নিক বা মাইক্রোপ্লাস্টিক দূর হয় না, আর ফোটানো পানি নোংরা জগ বা বোতলে রাখলে আবার দূষিত হতে পারে।
ঢাকার ট্যাপের পানিতে কি ফিল্টার বোতল ব্যবহার করা যায়?
হ্যাঁ। ট্যাপের পানির জন্যই Hydra তৈরি। এর ফিল্টার ৯৯% ব্যাকটেরিয়া ও পরজীবী দূর করে; এই দাবি বুয়েটের BRTC কর্তৃক সনদপ্রাপ্ত। মাইক্রোপ্লাস্টিক দূর করার বিষয়টি বুয়েটের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষিত। এটি ভাইরাস দূর করে না, তাই বন্যা বা পানি ফুটিয়ে খাওয়ার নির্দেশনার সময় পানি ফুটিয়ে নিন।
ট্যাপের পানি সাধারণত কোথায় দূষিত হয়?
ঢাকার পানি নিয়ে গবেষণাগুলো সরবরাহ লাইন ও বাসার দিকেই ইঙ্গিত করে: ফুটো পাইপ, ছাদ ও মাটির নিচের ট্যাংক, আর পাত্রে জমিয়ে রাখা পানি। সরবরাহের শেষ বিন্দুতে মাপা পানি, সেই একই পানি বাসায় এনে জমিয়ে রাখার পরের চেয়ে অনেক বেশি পরিষ্কার ছিল।
ফিল্টার বোতল কি ট্যাপের পানি থেকে আর্সেনিক দূর করে?
না। Hydra আর্সেনিক, ভাইরাস বা লবণ দূর করে না। আর্সেনিকের ঝুঁকি মূলত নলকূপের ভূগর্ভস্থ পানিতে। নলকূপের পানি খেলে এমন নলকূপ ব্যবহার করুন, যা পরীক্ষা করে আর্সেনিকমুক্ত বলে চিহ্নিত।
তথ্যসূত্র
- The Daily Star (editorial) (2022). No point in WASA water only being safe at source. The Daily Star.
- Mahbub KR, Nahar A, Ahmed MM, Chakraborty A (2011). Quality Analysis of Dhaka WASA Drinking Water: Detection and Biochemical Characterization of the Isolates. Journal of Environmental Science and Natural Resources 4(2):41–49.
- The Daily Star (2019). Harmful bacteria in Wasa water (tests by BUET, Dhaka University and icddr,b for the Local Government Division). The Daily Star.
- The Daily Star (2017). 99pc water used by slum people contains faecal contamination (Lancaster University and Dhaka University study). The Daily Star.
- Hasan MM, Hoque Z, Kabir E, et al. (2022). Differences in levels of E. coli contamination of point of use drinking water in Bangladesh. PLOS ONE 17(5):e0267386.
- Hossain MB, Yu J, Sarker PK, et al. (2024). Microplastic accumulation, morpho-polymer characterization, and dietary exposure in urban tap water of a developing nation. Frontiers in Sustainable Food Systems 8.
- World Health Organization (2015). Boil water: technical brief. WHO.
- US Centers for Disease Control and Prevention (n.d.). Household water treatment. CDC.
- Flanagan SV, Johnston RB, Zheng Y (2012). Arsenic in tube well water in Bangladesh: health and economic impacts and implications for arsenic mitigation. Bulletin of the World Health Organization 90(11):839–846.
লিখেছেন Nawfel Ahamad, বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং গ্র্যাজুয়েট এবং Hydra-র সহ-প্রতিষ্ঠাতা। এই গাইড সাধারণ তথ্যের জন্য, চিকিৎসা পরামর্শ নয়। কোনো পানির উৎস নিয়ে নিশ্চিত না হলে পান করার আগে একজন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞকে জিজ্ঞেস করুন, অথবা আমাদের জিজ্ঞেস করুন। তথ্যসূত্রগুলো মূল ভাষায় দেওয়া হয়েছে।


