বাংলাদেশে বন্যার সময় নিরাপদ খাবার পানি: কী করবেন

বন্যার পানি নলকূপ, ট্যাংক ও পাইপে ঢুকে পড়ে। তখন খাবার পানি কীভাবে নিরাপদ করবেন: কী ফোটাবেন, ঘোলা পানি কী করবেন, আর ফিল্টার বোতল কোথায় কাজে আসে।

টিনের চালের ঘরের সারির পাশে বন্যায় ডোবা গ্রামের পথ ধরে ঢাকনা দেওয়া ধাতুর কলসি নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক নারী।

সংক্ষেপে উত্তর

বন্যার সময় সব খাবার পানিকে অনিরাপদ ধরে নিন, স্বচ্ছ দেখালেও। এক মিনিট টগবগ করে ফোটান, বা নির্দেশনা অনুযায়ী পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ব্যবহার করুন। পানি ঘোলা হলে আগে ছেঁকে বা থিতিয়ে নিন। ফিল্টার বোতল ব্যাকটেরিয়া ও পরজীবী দূর করে, কিন্তু ভাইরাস নয়, তাই সঙ্গে ফোটান বা জীবাণুমুক্ত করুন।

প্রতি বর্ষায় বাংলাদেশের কোথাও না কোথাও বন্যা হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে পূর্বাঞ্চলের আকস্মিক বন্যায় ফেনী ও নোয়াখালী থেকে কুমিল্লা ও মৌলভীবাজার পর্যন্ত ১১টি জেলার প্রায় ৫৮ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন, আর পানি, পয়োনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্যবিধির ব্যবস্থা পানির নিচে চলে যায়, যাতে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে[১]।

বন্যায় বিপদ প্রায়ই পানি ফুরিয়ে যাওয়া নয়, ভুল পানি পান করা। এই গাইডে বন্যার পানি খাবার পানির কী করে আর কোন সহজ ধাপে তা নিরাপদ হয়, তা তুলে ধরা হলো।

বন্যায় খাবার পানি কেন অনিরাপদ হয়

বন্যার পানি যা কিছু ঢেকে ফেলে তার সঙ্গেই মিশে যায়: ল্যাট্রিন, ড্রেন, পশুর বর্জ্য, কৃষি রাসায়নিক ও জ্বালানি। এটি অগভীর নলকূপ, পুকুর, খোলা ট্যাংক ও ভাঙা পাইপে ঢুকে পড়ে, সঙ্গে নিয়ে আসে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও পরজীবী। ঠিক এ কারণেই বন্যার সময় ও পরের সপ্তাহগুলোতে ডায়রিয়াজনিত রোগ দ্রুত ছড়ায়।

বন্যার সময় সব খাবার পানিকে অনিরাপদ ধরে নিন, স্বচ্ছ দেখালেও। পানি দেখতে পরিষ্কার হলেও তাতে জীবাণু থাকতে পারে[৫]।

ধাপ ১: পানি ঘোলা হলে আগে পরিষ্কার করুন

পানির ময়লা জীবাণুকে আড়াল করে আর ক্লোরিনের কার্যকারিতা কমায়, তাই স্বচ্ছ পানিতে শোধন অনেক ভালো কাজ করে[৪]। সিডিসির পরামর্শ হলো, ঘোলা পানি একটি পরিষ্কার কাপড়, পেপার টাওয়েল বা কফি ফিল্টারের মধ্য দিয়ে ঢালুন, অথবা ময়লা নিচে থিতিয়ে পড়া পর্যন্ত রেখে দিয়ে ওপরের স্বচ্ছ পানি তুলে নিন[২]।

ধাপ ২: জীবাণু মারুন

ফোটান: সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়

স্বচ্ছ পানি টগবগ করে ফোটান, যাতে বড় বড় বুদ্বুদ ওপরে ভেঙে পড়ে, আর এক মিনিট এভাবে রাখুন[২]। ফোটালে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও পরজীবী মারা যায়[৩]। ঢাকনা দেওয়া পাত্রেই ঠান্ডা হতে দিন, তারপর পরিষ্কার, ঢাকনাওয়ালা পাত্রে রাখুন।

অথবা জীবাণুমুক্ত করুন, ফোটাতে না পারলে

গ্যাস বা জ্বালানি না থাকলে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, যা প্রায়ই ত্রাণকর্মীরা বিতরণ করেন, অথবা গন্ধহীন গৃহস্থালি ব্লিচ দিয়ে পানি জীবাণুমুক্ত করা যায়। প্যাকেটের মাত্রা ঠিক মেনে চলুন, ঘোলা পানির জন্য নির্দেশনায় বলা থাকলে তবেই বেশি দিন, আর পান করার আগে পুরো সময় অপেক্ষা করুন: ব্লিচের ক্ষেত্রে সিডিসি অন্তত ৩০ মিনিট অপেক্ষার পরামর্শ দেয়[২]। একটি সীমাবদ্ধতা জেনে রাখুন: ক্রিপ্টোস্পোরিডিয়াম পরজীবীর বিরুদ্ধে ক্লোরিন দুর্বল[৪], যা সম্ভব হলে ফিল্টার করা বা ফোটানোর আরেকটি কারণ।

বন্যায় ফিল্টার বোতল কোথায় কাজে আসে

বন্যায় শুধু ফিল্টার বোতল যথেষ্ট নয়। Hydra ৯৯% ব্যাকটেরিয়া ও পরজীবী দূর করে; এই দাবি বুয়েটের BRTC কর্তৃক সনদপ্রাপ্ত। এটি ভাইরাস দূর করে না, আর পয়োবর্জ্য বয়ে আনা বন্যার পানিতে ভাইরাসের ঝুঁকি অনেক বেশি। বহনযোগ্য ফিল্টার ভাইরাস দূর করে না[২]।

তবু বন্যায় ফিল্টার বোতল কাজে আসে, দুটি ধাপের একটি হিসেবে:

  • আগে ফোটান, তারপর ঠান্ডা পানি ফিল্টার করুন। ফোটালে ভাইরাস মারা যায়; ফিল্টার দূর করে ফোটানোর পরও থেকে যাওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিক।
  • অথবা আগে ফিল্টার করে পরে জীবাণুমুক্ত করুন। বাকি ভাইরাস মারতে ফিল্টার করা পানিতে রাসায়নিক জীবাণুনাশক মেশানোর পরামর্শ দেয় সিডিসি[২]।

বন্যার পরে নলকূপ

বন্যার পানির নিচে থাকা নলকূপ পানি নেমে গেলেই নিরাপদ হয় না। নলকূপ ও তার চারপাশের পাকা অংশ পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করা, আর সম্ভব হলে পরীক্ষা করা পর্যন্ত এর পানি ফুটিয়ে বা জীবাণুমুক্ত করে খান। আপনার এলাকার ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক থাকলে মনে রাখুন, ফোটানো বা ফিল্টার, কোনোটিই তা দূর করে না; আর্সেনিকমুক্ত চিহ্নিত নলকূপ ব্যবহার করুন।

নিরাপদ পানি নিরাপদে রাখুন

  • শোধন করা পানি ঢাকনাওয়ালা পরিষ্কার পাত্রে, মেঝে থেকে উঁচুতে ও বন্যার পানি থেকে দূরে রাখুন।
  • ঢেলে বা কল দিয়ে নিন; পাত্রে কাপ বা হাত ডোবাবেন না।
  • আবার ভরার আগে শোধন করা পানি দিয়ে পাত্র ধুয়ে নিন।
  • শুধু খাওয়া নয়, দাঁত মাজা, খাবার ধোয়া ও শিশুর দুধ বানাতেও শোধন করা পানি ব্যবহার করুন।

পরের বন্যার আগে: একটি সহজ প্রস্তুতি

  • প্রথম এক-দুই দিনের জন্য সিল করা বোতলের পানি।
  • পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, আর ফোটানোর জন্য জ্বালানিসহ লাইটার বা দেশলাই।
  • ঢাকনাওয়ালা দুটি পরিষ্কার পাত্র, আর ঘোলা পানি ছাঁকার জন্য একটি পরিষ্কার কাপড়।
  • মাইক্রোপ্লাস্টিক দূর করতে ও প্রথম ধাপ হিসেবে একটি ফিল্টার বোতল, কখনোই একমাত্র ধাপ হিসেবে নয়।
  • কারও ডায়রিয়া হলে খাবার স্যালাইন (ওআরএস)।

মূল কথা

বন্যায় ধরে নিন সব উৎস দূষিত। আগে ঘোলা পানি পরিষ্কার করুন, তারপর এক মিনিট ফোটান বা নির্দেশনা অনুযায়ী জীবাণুমুক্ত করুন, আর ঢেকে রাখুন। ফিল্টার বোতল একটি কাজের বাড়তি ধাপ, কিন্তু বন্যার পানিতে ভাইরাস থাকতে পারলে কখনোই একমাত্র ধাপ নয়। প্রতিদিনের জন্য পদ্ধতিগুলোর তুলনা দেখুন পানি ফোটানো, ফিল্টার বোতল নাকি বোতলের পানি গাইডে।

মানুষ যা জানতে চান

বন্যার পরে নলকূপের পানি কি নিরাপদ?

শোধন না করা পর্যন্ত নয়। বন্যার পানি নলকূপ ও তার চারপাশে ঢুকে যেতে পারে। পানি নেমে যাওয়ার পর নলকূপ পরিষ্কার, জীবাণুমুক্ত ও সম্ভব হলে পরীক্ষা করা পর্যন্ত পানি ফুটিয়ে বা জীবাণুমুক্ত করে খান।

বন্যার সময় পানি কতক্ষণ ফোটাব?

স্বচ্ছ পানি বড় বড় বুদ্বুদসহ টগবগ করে এক মিনিট ফোটান। পানি ঘোলা হলে আগে পরিষ্কার কাপড়ে ছেঁকে নিন বা থিতিয়ে নিন, তারপর স্বচ্ছ পানি ফোটান।

বন্যার পানিতে কি ফিল্টার বোতল ব্যবহার করা যায়?

শুধু এটি দিয়ে নয়। Hydra-র মতো ফিল্টার বোতল ব্যাকটেরিয়া ও পরজীবী দূর করে, কিন্তু ভাইরাস নয়, যা বন্যার পানিতে বড় ঝুঁকি। পানি ফোটান বা জীবাণুমুক্তও করুন: মাইক্রোপ্লাস্টিকও বাদ দিতে চাইলে আগে ফুটিয়ে ঠান্ডা পানি ফিল্টার করুন।

পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট কি ঘোলা পানিতে কাজ করে?

কম ভালো করে। ঘোলা পানির ময়লা ক্লোরিন খরচ করে ফেলে। আগে পানি ছেঁকে বা থিতিয়ে নিন, প্যাকেটের মাত্রা মেনে চলুন, নির্দেশনায় বলা থাকলে তবেই দ্বিগুণ দিন, আর পান করার আগে পুরো সময় অপেক্ষা করুন।

পানি ফোটালে কি বন্যার পানির রাসায়নিক দূর হয়?

না। ফোটালে জীবাণু মারা যায়, কিন্তু বন্যার পানিতে আসা জ্বালানি, কীটনাশক বা অন্য রাসায়নিক দূর হয় না। পানিতে রাসায়নিক দূষণের আশঙ্কা থাকলে সিল করা বোতলের পানি বা নিরাপদ উৎসের পানি ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্র

  1. Dhaka Tribune (2024). UN: Floods hit 5.8 million people in 11 districts in Bangladesh. Dhaka Tribune.
  2. US Centers for Disease Control and Prevention (n.d.). How to Make Water Safe in an Emergency. CDC.
  3. World Health Organization (2015). Boil water: technical brief. WHO.
  4. US Centers for Disease Control and Prevention (n.d.). Water Disinfection for Travelers (CDC Yellow Book). CDC.
  5. US Centers for Disease Control and Prevention (n.d.). About Water Treatment Options When Hiking, Camping, or Traveling. CDC.

লিখেছেন Nawfel Ahamad, বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং গ্র্যাজুয়েট এবং Hydra-র সহ-প্রতিষ্ঠাতা। এই গাইড সাধারণ তথ্যের জন্য, চিকিৎসা পরামর্শ নয়। কোনো পানির উৎস নিয়ে নিশ্চিত না হলে পান করার আগে একজন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞকে জিজ্ঞেস করুন, অথবা আমাদের জিজ্ঞেস করুন। তথ্যসূত্রগুলো মূল ভাষায় দেওয়া হয়েছে।